ফেলুকাহিনী

 


ফেলুকাহিনী

ফেলুকাহিনী


' ইয়াদ পিয়া কে আয়ে ---------- "  

সেকিরে ! ফেলা গান গাইছে !

রতন দার হোটেলে সকাল্বেলায় কচুরি , চা এইসব পাওয়া যায় , দুপুরে ভাত আর রাত্রে ভাত রুটি ইত্যাদি । তো আমরা কয়েকজন ফেলা কে কাঠি করতে সকাল সকাল রতন দার বেঞ্চে গিয়ে ব'সতাম , সবাই মিলে ফেলার পিছনে লাগতাম , কিন্তু ফেলা রাগ করত না বরং সম্মান করত ।

-- কি ব্যাপার ফেলুরাম ,মনে ফাগুন , তাও আবার ক্লাসিক্যাল ?

অমরদা তোল্লা দেবার ভঙ্গীতে বল্ল - এই ফেলা , খুব  সুন্দর হচ্ছে মাইরি , পুরোটা গেয়ে শোনা না !

-- আরে পুরোটা কোথায় পাব অমরদা , লারা এক লাইনেই তো রাত কাবার !

আমরা রহস্যের গন্ধ পেয়ে ফেলাকে চেপে ধরলাম ( প্রসঙ্গতঃ " ব্রায়ান লারা "র ভক্ত ব'লে ফেলার মুখ দিয়ে তার নাম সবসময় উচ্চারিত হয় ) ।

আমি বলি ,- কেসটা কি রে ফেলা ? বল্ তাড়াতাড়ি !

--- আরে গত পরশু দিন সবাই অনেক করে বলল চল ওস্তাদ বসির খাঁ এর ফাংশন দেখে আসি , হেব্বি ক্লাসিক্যাল গায় । আমি রোবিন্দো সঙ্গীত আর এফ এম শুনি , ক্লাসিক্যাল কি , কিচ্ছু জানিনা , লারা হ্যাঁ বলে দিলাম আর দেড় হাজার টাকার টিকিট কেটে লারা একদম সাম্নের সীটে গিয়ে বস্লাম ।

--- তারপর ?

--- তারপর আর কি ? রাত ন টায় শুরু হবে বলেছিল ,  সাড়ে আট টায় চলে গেস্লাম , ঠিক নটায় ওস্তাদ এল । গাল ভর্তি পান না গুটখা কে জানে , আর লারা তেমনি থোবড়াখানা মাইরি !

--- এই ওভাবে বলতে নেই , পণ্ডিত মানুষ, কতো নাম যশ !

--- পাড়ায় কোনদিন দেখতে পেলে ওর পণ্ডিতির একশো আট করে দেব !

--- কেন কি করেছে ?

--- কি করেছে শুনবে ? শোন তাহলে ,-

লারা নটার থেকে পৌনে দশটা অব্দি শুধু তবলা ঠিক করতে লাগ্ল ! টিকি টাং টিকি টাং টিকি টাং  ঠক ঠক !---- করতে করতেই পৌনে এক ঘন্টা ! কেন লারা বাড়ী থেকে ঠিক করে আনা যায় না ?

তারপর যখন তবলা ঠিক হল ঢোল ওয়ালা তার ঢোল নিয়ে পড়ল , যেন বোল ফোটাচ্ছে ,-

তাক্ তেরিকিটি হেগে ছেরিকিটি পুকুরের ধারিকিটি ঝাঁ !

তাক্ তেরিকিটি হেগে ছেরিকিটি পুকুরের ধারিকিটি ঝাঁ !

তাই দেখে তবলা ভাবল, হাম কিসিসে কম নেহী ! শুরু করল,-- 

ধিন্ তাকের বেটি তিন তাক্- তোর মা রেঁধেছে পুঁইশাক - আমি দিতে থাকি তুই খেতে থাক্ , খেতে থাক্ , খেতে থাক্ !!!!!

ঠিক রাত দশটায় ওস্তাদজী এসে আসনে বসল তানপুরা নিয়ে ! পাশে পিকদানি তে একগাদা পিক ফেলে আরো গোটাপাঁচেক পান একদিকের গালে ঠেসে দিয়ে চিবাতে লাগল !

আমি চোখ বন্ধ করে একটু ঝিমোবার চেষ্টা করছি -- কতক্ষণ হয়েছে জানিনা , -- আ-আ-আ-আ-আ করে একটা সুর শুনতে পেলাম , আরো ঝিমুনি ধরে গেল , আচমকা এত জোরে হা-আ-আ-আ- করে উঠল যে ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লাম ! এক মহিলা বাচ্চা কোলে ঝিমোচ্ছিল, তার বাচ্ছা কোল থেকে গেল ছিটকে , চিল চিৎকার , এক বুড়ো বুকের বাঁদিকে হাত রেখে চেয়ারে ঢলে পড়ল , কার চেয়ার ওল্টাল , সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা ! যাই হোক , পরে ওস্তাদের সুমতি হল,-- 

এগারোটার সময় ওস্তাদ গান ধরল ,-- ইয়াদ পিয়া কে আয়ে----------- হায়ে ---- ইয়াদ পিয়া কে আয়ে --------------------------  !!

সবাই বাহ বাহ করে হাত তালি দিয়ে উঠল , আমিও লারা তাল মেলাতে হাত তালি দিলাম আর ওস্তাদ গাইতে লাগল ,-

ইয়াদ / পিয়া / কে আ------------এ---- হায়ে -- ! ই------আ----দ----পি---য়া ----- কে / আ-------------------এ----------------!!!

ই-------------------- য়াদ / পিয়া ক্কে ----------------------আয়ে--- !!

লারা ঘন্টা দুয়েক ধরে ঐ এক লাইন গানের এধার ওধার সেধার , একেবারে গুস্টির ষষ্ঠী পূজা করে ছাড়ছে !

ভাবলাম একটু ঘুমাই , তার ও কি জো আছে ? যেই না ঘুমটা আসে ,শুড্ঢা মনে হয় বুঝতে পারে আর এত জোরে হা-আ-আ-আ করে ওঠে , ঘুমের লারা মা বহিন হয়ে যায় !

 ভোর চারটে , সে তখন ও - ইইইইই---আআআ ---দ / পিয়া / ক্কে- আআআআআআআ----এ--------- হাআআআআআআ এ এ এ এ ----

আমি আর থাকতে না পেরে বলি , ওস্তাদজী , সারা রাত ধরে খালি  এক লাইন ভেঁজে যাচ্ছ , গোটা গান কখন গাইবে ? ভুলে গেলে লারা অন্য গান ধরতে পারছ না ?

তারপর পেছনের লোকগুলো এসে আমাকে ধরে ধাক্কিয়ে বের করে দিল ,

আমার দেড় হাজার টাকা মায়ের ভোগে !

তবে গুরু গানের লাইন্টা হেব্বি ! তাই গুনগুন করি আর কি !


বস্ আমাকে ঐ গানের একটা সিডি এনে দেবে ? 

হাসব না কাঁদব কেউ বুঝতে পারছিলাম না , ফেলাকে সিডি এনে দেব বলে সেদিনের মত উঠলাম ।

পরিচিত

নাম- জগদীশ মাইতি , জন্মস্থান ,- জ্যোৎঘনশ্যাম ,পশ্চিম মেদিনীপুর ,থানা দাসপুর-২ ।

অকপট সাহিত্য পত্রিকায় তিনটি স্্খ্যায় তিনটি লেখা প্রকাশিত , * চতুষ্পর্ণী ,* শিশু সমাজ ও ভবিষ্যৎ, * জোয়ার-ভাটা সংঘ ( রম্য )